
অনির্ণেয়
‘অনির্ণেয়’ গল্পগ্রন্থের ছোটগল্পগুলোতে লেখক হাসান মাহমুদ হক বাস্তবতার চেয়ে বেশি কিছুর ছবি এঁকেছেন। সরল কিংবা জটিল রকমের আপাত অনির্ণেয় সত্য কিংবা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন অত্যন্ত নির্মোহ এবং সাবলীল ভঙ্গিতে। তিনি শুধু বর্ণহীনভাবে বর্ণনা দিয়ে যান না, সবসময় তার লক্ষ্য থাকে রং ও রসের সমন্বয়ে শিল্প সৃষ্টি করা। তার গদ্য পরিণত, এখনকার অনেক তরুণ লেখকের লেখার মতো কাঁচা গন্ধ তাতে একেবারেই নেই। তার গল্পের চরিত্রেরা আমাদের আশেপাশেরই চেনা-পরিচিত মানুষ। চেনা মানুষের ভেতরে অচেনা এবং অমূল্য রত্নের সন্ধান করেন লেখক। আসলে এই চেনা মানুষের মতো সব গল্পই তো চেনা হয়ে গেছে পাঠকদের, তাই লেখক চেষ্টা করেন একটু নতুনভাবে আর আরেকটু সুন্দরভাবে এই গল্পগুলোকে উপস্থাপন করতে। বর্তমান সময়ে যখন প্রায় নগ্নভাবে প্রভাবিত লেখকদেরকেই কদর করছেন অধিকাংশ অনন্যোপায় পাঠক, তখন হাসান মাহমুদ হকের রচনায় সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত এবং স্বকীয় একটা স্টাইল দেখতে পাওয়া যাবে একটু চোখ মেলে চাইলেই। লেখকের সৃষ্টির সুন্দরের জগতে পাঠককে আমন্ত্রণ।
What Readers Love
Innovative and original sci-fi concept
Deep philosophical questions about identity and consciousness
Fast-paced plot with unexpected twists
Rich world-building and immersive setting
Sample Chapter
সন্ধ্যাপ্রদীপ
মাতৃগর্ভের মমতাময় অন্ধকারে আবির্ভূত হয়ে মহাকালের গর্ভের নির্মম অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাবার মাঝখানের ক্ষুদ্র কিন্তু বিস্ময়কর জীবনটা মানুষের কাটে আশার মায়াবী আলোয় খুঁজে নেয়া পথে চলে। জীবনের পথ চলতে চলতে জীবন বদলে যাবার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা মোড়ে এসে পৌঁছেছে নয়ন। ডাক্তার বিশ্বজিতের অতিশীতল চেম্বারে বসে আছে সে, ভালো কিছু শোনার আশা নিয়ে। বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছিলেন ডাক্তার সাহেব। সময় নিয়ে সেগুলোর রিপোর্ট দেখলেন তিনি মনোযোগ দিয়ে। তারপর একেবারে ভাবলেশহীন কণ্ঠে বললেন, ইয়াং ম্যান, রিপোর্ট ভালো নয়। তুমি কি একাই এসেছ? সাথে ফ্যামিলির কেউ থাকলে ভালো হতো।
ডাক্তার বিশ্বজিৎ যেভাবে নয়নকে ইয়াং ম্যান বললেন, সে আসলে ততটা ইয়াং না অর্থাৎ তরুণ না। তার বয়স উনত্রিশ পেরিয়েছে এবছর। এই বয়সেই মানুষ প্রথম বুঝতে পারে তার বয়স হচ্ছে, তারুণ্য বিদায় নিচ্ছে, চুলের রঙে কালোর দাপট কমছে। তবে বিশ্বজিতের তুলনায় ইয়াং ম্যান বলাই যায় নয়নকে। উনার চুল যে পরিমাণ পাকা দেখা যাচ্ছে, তাতে অনায়াসে ধরে নেয়া যায় বয়স ষাটের কম হবে না। এই বয়স্ক ডাক্তার এরকম সরাসরিই যেহেতু বললেন রিপোর্ট ভালো নয়, রিপোর্ট যথেষ্ট খারাপ বলেই ধরে নিল নয়ন। কারণ বয়সের সাথে শুধু চুলই পাকে না, ডাক্তারও পাকে। বড় একটা শ্বাস টেনে বুকে শক্তি আর সাহস সঞ্চয় করে নিয়ে নয়ন বলল, স্যার, ফ্যামিলি বলতে তো আছে শুধু আমার ছোটবোনটা। ও খুব দুর্বল, স্যার।
বিশ্বজিৎ বললেন, হাউ ওল্ড ইজ শি?
টোয়েন্টিথ্রি, স্যার। জীবনের কিছুই দেখেনি ও এখনও। তাই খারাপ কিছু হলে ওর আগে আমার শোনাই ভালো।
হোয়াটস হার নেম?
আঁখি, স্যার।
নয়ন অ্যান্ড আঁখি, ব্রাদার অ্যান্ড সিস্টার, ভেরি নাইস। ওয়েল, ইজ শি ম্যারিড?
ইয়েস, স্যার।
দ্যাট উইল হেল্প।
মেবি। আপনি আমাকে বলুন, স্যার, আমার কী হয়েছে।
বিশ্বজিৎ নিরুপায় মানুষের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করার চেষ্টা করলেন। তারপর একদম বিনা ভূমিকায় বললেন, মেডিকেলের ভাষায় এটাকে সংক্ষেপে বলে জিবিএম।
নয়ন বুঝতে পারল না। বলল, সেটা কী, স্যার? খুব খারাপ কিছু?
গ্লিওব্লাস্টোমা মাল্টিফরমি। এক ধরনের টিউমার বা ক্যানসার। ব্রেইনে হয়। হ্যাঁ, এটা খুব খারাপ ধরনের টিউমার।
মনের অজান্তেই নয়নের ডান হাতটা তার মাথায় চলে গেল। যেন টিউমারটা ছুঁয়ে দেখতে চাইল। স্পষ্টই বুঝতে পারল সে, যতটা ভেবেছিল রিপোর্ট তারচেয়েও খারাপ। পুরোপুরি স্পষ্ট হবার জন্যে বলল, আমি কি মারা যাচ্ছি, স্যার?
ডাক্তারদেরকে এ ধরনের প্রশ্ন জীবনে বহুবার শুনতে হয়। তাই এরকম চরম একটা প্রশ্নেও বিশ্বজিতের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। আমাদের দেশের ডাক্তাররা এরকম পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দেয়া শেখেননি এখনো। বাড়াবাড়ি রকমের স্বাভাবিক কণ্ঠে পুরোপুরি নিস্পৃহের মতো ডা. বিশ্বজিৎ বললেন, ওয়েল, ইয়াং ম্যান, আমরা সবাই প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি।
এরকম সময়ে এরকম কথা কারোরই ভালো লাগার কথা না। নয়ন তো রেগেই গেল কিছুটা। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে ভদ্রতা বজায় রাখল। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো শান্ত গলায় বলল, সবার ব্রেইনে তো আর টিউমার হয়নি, স্যার। আমার চিকিৎসা কী?
বিশ্বজিৎ বললেন, জিবিএম এর কার্যকর চিকিৎসা এখনো মেডিকেল সায়েন্সের অজানা। আম সরি, ইয়াং ম্যান।
কতটা সময় হাতে বাকি আছে আমার?
বইপত্র আর আমার অভিজ্ঞতা বলে পনেরো মাস।
পনেরো মাস। মানে মাত্র এক বছর তিন মাস। প্রচণ্ড ধাক্কা খেল নয়ন। মরিয়া হয়ে কাতর কণ্ঠে বলল, কিছুই কি করার নেই, স্যার?
আছে। নিশ্চয়ই আছে। এক্সপেরিমেন্টাল ট্রিটমেন্ট আছে, প্যালিয়েটিভ কেয়ার আছে। উই উইল ফাইট অ্যাজ লং অ্যাজ ইউ ওয়ান্ট। অ্যান্ড উই উইল ট্রাই টু ইজ ইয়োর পেইন অ্যাজ মাচ অ্যাজ উই ক্যান।
এক্সপেরিমেন্টাল ট্রিটমেন্ট! শেষকালে ওষুধ কোম্পানির গিনিপিগ? আর পেইন কমানোর কথা যেহেতু বললেন ডাক্তার, বোঝা যাচ্ছে অসহনীয় পেইন দেখা দেবে আস্তে আস্তে। নয়নের ভেতরটা টর্নেডো-আক্রান্ত লোকালয়ের মতো এলোমেলো হয়ে গেল। তার সমগ্র অস্তিত্ব যেন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে। কী চিন্তা করবে, কোথা থেকে চিন্তাটা শুরু করবে, কিছুই বুঝতে পারল না সে। কোনোরকমে বলল, স্যার, আমি কিছু ভাবতে পারছি না। আমার একটু সময় দরকার। আজ আসি, স্যার। কয়েকদিন পর দেখা করব আবার।
বিশ্বজিৎ এবার নয়নের প্রতি সমমর্মী হলেন খানিকটা। বললেন, ওকে, ইয়াং ম্যান। বি স্ট্রং। ডোন্ট গিভ আপ। উই আর হিয়ার ফর ইউ।
নয়ন আর কথা না বাড়িয়ে কৃত্রিম হাসির মাধ্যমে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলো ডাক্তারের চেম্বার থেকে। বাইরে এসে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিজের বর্তমান অবস্থার একটা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করল সে। অদ্ভুতভাবে কেমন যেন অনুভূতিশূন্য লাগল তার, যেন তীব্র আঘাতে শরীর-মন অবশ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় এই মুহূর্তে ঠিক কেমন বোধ করার কথা বা কেমন বোধ করা উচিত, তা বুঝতে পারল না নয়ন। কী করবে এখন তাও ভেবে পেল না। জীবনের চরম মুহূর্তগুলোতে মাঝেমাঝে মানুষের এরকম হয়। কেমন ফাঁকা হয়ে যায় সব।
নয়ন দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে। কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই একবার চারদিকে চোখ বোলাল সে। রাস্তার উল্টোপাশ ঘেঁষে সগৌরবে দাঁড়ানো যমজের মতো একজোড়া বিশাল রেইনট্রি গাছের পাতায়-শাখায় ভৌতিক আবহ তৈরি করে সন্ধ্যা হচ্ছে। নেমে আসছে নিরাশার অন্ধকার। এই অনিবার্য আঁধারকে নির্মূল করার উচ্চাভিলাষ নিয়ে সবখানে জ্বলে উঠছে কৃত্রিম বাতি। হাতঘড়িতে সময় দেখল নয়ন। তার মনে হলো, সেকেন্ডের কাঁটাটা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত চলছে। তাহলে প্রকৃতিরও ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে বেঁধে দেয়া জীবনের বিরুদ্ধে! তার জীবনেও সন্ধ্যা নামছে দ্রুতগতিতে।
অস্থির হয়ে ওঠার বদলে আশ্চর্যরকমভাবে শান্ত হয়ে গেল নয়নের মনটা। প্রকৃতি কিংবা বিধাতার কাছে আত্মসমর্পণ করল সে। বিধাতার কোনো ইশারার খোঁজে কিংবা হয়তোবা স্বয়ং বিধাতাকেই দেখার আশায় আকাশের দিকে তাকাল অসহায়ের মতো। সন্ধ্যার আকাশে রঙের অনবদ্য কিন্তু মিলিয়মান রূপ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না তার। হয়তো এটাই বিধাতার ইশারা। হয়তো জীবনের অপরিমেয় সৌন্দর্যই বিধাতার রূপ।
বিধাতা সব জানেন। কিন্তু তাঁকে প্রশ্ন করে কখনোই কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। তাই নয়ন গুগলকে প্রশ্ন করল ডাক্তারের কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে। কিংবা হয়তো একটু আশার আলো খোঁজার জন্যে। গুগল জানাল, ডাক্তার সাহেব কমিয়েও বলেননি, বাড়িয়েও বলেননি। সময় বাকি পনেরো মাস। কমও হতে পারে। কিন্তু বেশি হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
হঠাৎ বাতাসের জোরালো একটা ঝাপটা বয়ে গেল। নয়নের সামনে একসারি মেহগনি গাছ থেকে মৃত শুকনো পাতারা ঝরে পড়ল ধুলোয়। বাতাসের ঝাপটায় অথবা অচেনা একটা ভয়ে তার শরীরে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। কেঁপে উঠল তার দুর্বল শরীর আর তারচেয়েও দুর্বল মনটা। বিশেষ কিছু না ভেবেই হাঁটতে শুরু করল সে উদ্দেশ্যহীনভাবে, হয়তো পালানোর চেষ্টা করল সব পেছনে ফেলে নিরুদ্দেশে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, এত মানুষ এই শহরে, এই দেশে, এই পৃথিবীতে, সবাই থাকবে, আমি থাকব না? এত অল্প বয়সেই চলে যেতে হবে?
তীব্র যন্ত্রণাময় ভাবনাটা নয়নের ভেতরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিল অদরকারী কাগজের মতো। বিপন্ন লাগল তার। মনটা আশ্রয় খুঁজল। মনে পড়ল মায়ের কথা। মা চলে গেছেন বেশ কয়েক বছর হলো। বাবা চলে গেছেন আরও কয়েক বছর আগে। উনারা থাকলে অনেকটা মানসিক আশ্রয় পাওয়া যেত এটা ঠিক। কিন্তু তখন তাদেরকে রেখে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে কষ্ট আরো বেশি হতো। কিছু কিছু সময় মনে হয়, বাবা-মা চলে গেছেন ভালোই হয়েছে!
আনমনে হেঁটে বেশ অনেকদূর চলে এলো নয়ন জীবনের মতো অচেনা পথ ধরে। রাস্তার পাশে ছোট একটা চায়ের দোকান পেল। তৃষ্ণা পেয়েছিল তার অনেকটা পথ হেঁটে এসে। দোকানের পানির ড্রাম থেকে তুলে নিয়ে এক গ্লাস পানি খেল সে। পানি খুব স্বাদ লাগায় আরো এক গ্লাস খেল। পানি খেয়ে সামান্য শান্ত বোধ করল। হাজার হোক, পানির অপর নাম তো জীবন।
চা খাবে ভাবল নয়ন। দোকানের মলিন আর নড়বড়ে বেঞ্চে বসে চায়ের অর্ডার দিল। বলল, মামা, এক কাপ চা দিয়েন।
মামা অর্থাৎ চায়ের দোকানদার বললেন, কী চা, মামা? লাল না দুধ?
নয়ন দুধ চা-ই খায় সাধারণত। বলল, দুধ চা, মামা। দুধ-চিনি বাড়ায়া দিয়েন।
মামা দক্ষ হাতে চা বানিয়ে ফেললেন চটপট। চায়ের কাপ নয়নের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, কী ছিগেট দিমু, মামা? বেনছন না গোললিপ?
এসব টং দোকানে চায়ের সাথে সিগারেট খাওয়াটা অনেকটা নিয়মের মতো। নয়ন সিগারেট খায় না। খায় না বলে যে কোনদিন খায়নি তা নয়। মাঝেসাঝে এক-দুই টান দেয় বন্ধুদের সাথে। তাতে সিগারেট সম্পর্কে সামান্য ধারণা তৈরি হয়েছে তার। সিগারেট তার ভালো লাগে, বেশ ভালো। সিগারেট খেলে অনেকটাই হালকা লাগে, যেন কোনো চিন্তা নেই এরকম হালকা। হালকা লাগে বা ভালো লাগে বলেই এত এত মানুষ এত এত বেশি সিগারেট খায়। কিন্তু নয়ন খায় না অকালে মারা যাবার ভয়ে। ধূমপানের কারণে অকালমৃত্যুর কথা মনে হতেই বোকার মতো হেসে ফেলল সে উচ্চস্বরে। হঠাৎ হাসির কী হলো তা বুঝতে না পেরে দোকানদার মামা সামান্য অবাক হলেন, কিন্তু কিছু বললেন না বা বলার সু্যোগ পেলেন না। নয়নই হাসি থামিয়ে খানিকটা বিব্রত স্বরে বলল, বেনসন লাইট আছে, মামা?
মামা পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হেসে বললেন, অহনো মাইয়াগো ছিগেট খান, মামা?
নয়ন মুখে লাজুক হাসি ফুটিয়ে বলল, লাইটটা একটু কম ক্ষতি করে তো, মামা। আচ্ছা, গোল্ডলিফই দ্যান একটা।
মামা গোল্ডলিফ সিগারেটের একটি শলাকা এগিয়ে দিলেন, নয়ন হাতে নিল। সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে দোকানের বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালাল। অভ্যেস না থাকায় একটু বেগ পেতে হলো তাকে। দুআঙুলে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট আর তিন আঙুলে ধরা ধূমায়িত চায়ের কাপ নিয়ে বেঞ্চে বসল সে আরাম করে। ছোট করে টান দিল সিগারেটে। লম্বা করে শ্বাস টেনে ধোঁয়ার সাথে নিকোটিন পৌঁছে দিল ফুসফুসে। নিশ্বাসের সাথে ধোঁয়া ছাড়ল বাতাসে। তারপর চায়ে চুমুক দিল। কয়েক টান এবং কয়েক চুমুকের পর নিকোটিন আর ক্যাফেইনের সম্মিলিত ক্রিয়ায় বেশ ভালো লাগল তার। সুখী মানুষের মতো সে ভাবল, এই তো জীবন, একটু ভালো লাগা, একটু ভালো থাকা। এর বেশি আর কী চাই?
চা-সিগারেট শেষ করে দাম মিটিয়ে আবার বেঞ্চে বসল নয়ন। হাতে কিছু সময় আছে, কিন্তু কোনো কাজ নেই। এরকম সময়ে বর্তমান যুগের মানুষের অবধারিত গন্তব্য ফেসবুক। কোনোরকম উদ্দেশ্য বা চিন্তাভাবনা ছাড়াই মোবাইলফোন বের করে ফেসবুকে ঢুকে পড়ল নয়ন। ফেসবুকের ভার্চুয়াল ভিড়ের ভেতর তীব্র একাকিত্ব বোধ করল। রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গ কামনা করল তার দুর্বল মনটা।
এখন সঙ্গ দেবার মানুষ কোথায় পাবে নয়ন? ফেসবুকের বুকেই চোখ মেলে খুঁজতে শুরু করল। খুঁজতে খুঁজতে একজন রমণীর ঠোঁটে নয়নের চোখ আটকে গেল। মানে রমণীর ছবিতে। খুব মাথা খাটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে শুধু রমণীর ঠোঁটজোড়া, চিবুক আর তিন আঙুলে নান্দনিক ভঙ্গিতে ধরা লিপস্টিক। ঠোঁট রাঙানো রয়েছে রক্তের মতো লাল রঙে। এই ঠোঁটজোড়া ওই রকমের গড়নের, যা দেখলেই চুমু খেতে ইচ্ছে করে, আর তার ওপর ঠোঁটের ভঙ্গিমাটাও তুমুল আবেদনময়ী। এই ছবিতে যেকোনো পুরুষের চোখ আটকাতে বাধ্য।
ছবির রমণী নয়নের বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবী জয়া। অসম্ভব সুন্দরী আর দারুণ রকমের ব্রিলিয়ান্ট। খ্যাপাটে মেয়ে বলে ক্যাম্পাসে সুনাম বা দুর্নাম ছিল তার। মোটামুটি ক্যাম্পাসের একজন তারকার মতো ছিল সে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে বাবা-মার বাসা থেকে বেরিয়ে এসে একা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকা শুরু করেছিল স্বাধীন জীবনযাপন করার জন্যে, স্বাধীনতার মানে বোঝার জন্যে।
জয়া নয়নের কাছের মানুষ ছিল না কখনও। আবার ঠিক দূরেরও না। নয়ন জয়ার প্রতি দুর্বল ছিল। একেবারে ভালোবাসার কাছাকাছি রকমের দুর্বল। কিন্তু সেরকম কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। বলতে চেয়েছিল। বলবে বলবে করছিল। কিন্তু কিছু মানুষের কেবলই দেরি হয়ে যায়। নয়ন জয়াকে কিছু বলার আগেই একদিন তাদের দুবছরের সিনিয়র অনিক ভাইয়ের সাথে ক্যাম্পাসে দেখা গেল জয়াকে। এরপর অবশ্য নানান সময়ে আরো কয়েকজনের সাথে তাকে দেখা গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বিয়ে করেছে অনিককেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে নয়ন আর জয়ার বন্ধুত্ব শক্তই ছিল। কিন্তু ক্যাম্পাস ছাড়ার পর অবস্থা বদলেছে। গত পাঁচ বছরে পাঁচবারও দেখা হয়নি তাদের। শেষবার দেখা জয়ার বিয়েতে। দুবছর আগের কথা সেটা। এখন যোগাযোগ যা আছে, তা এখনকার অন্যসব সামাজিক মানুষের মতো ওই ফেসবুকের নিউজফিডেই। জয়ার মোবাইল নাম্বারটা ছিল নয়নের ফোনে। কিন্তু এখন খুঁজে দেখল নেই, কারণ সম্প্রতি ফোন বদলেছে সে।
জয়ার প্রতি নয়নের দুর্বলতা ছিল সামগ্রিকভাবেই। তবে জয়ার অসাধারণ ঠোঁটের প্রতি সে দুর্বলতা ছিল বিশেষ রকমের। এতদিন পর সেই ঠোঁটজোড়া নতুন করে দেখে ঠোঁটের প্রতি আর তার মালিকের প্রতি পুরোনো দুর্বলতা জেগে উঠল তার মনে নাকি বিপন্ন মনটা একটা সম্ভাব্য মানবিক আশ্রয় পাবার আশাকে আঁকড়ে ধরতে চাইল, সেটা নিয়ে বেশি ভাবল না নয়ন। ফেসবুকে মেসেজ দিল জয়াকে। লিখল, কেমন আছ, জয়া? ফোন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার নাম্বারটা হারিয়ে ফেলেছি।
মেসেজটা দিয়েই তার মনে হলো, কাজটা ঠিক হলো না। এভাবে হ্যাংলামি করে বলার কী দরকার ছিল? জয়া কী মনে করবে? মেয়ে দেখলে মাথা ঠিক থাকে না এ বয়সেও!
অবশ্য নারী দেখে পুরুষের মাথা এলোমেলো হবার কোনো বয়স আসলে নেই। তবে সেটা নগ্নভাবে প্রকাশ পেলে তো লজ্জার কথা। কিন্তু কী আর করা? মেসেজ তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। মুছে ফেললেও একটা চিহ্ন থেকেই যায়। তাই মিনিট কয়েক নিজেকে তিরস্কার করল নয়ন বসে বসে। তারপর ওই মেসেজের কারণে ক্ষয়ক্ষতি যদি কিছু হয়ে থাকে তা দ্রুত মেরামত করার চেষ্টা করল। আরেকটা মেসেজ লিখতে গেল। এই সময় তার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের পর্দায় অচেনা নাম্বার দেখে সে কলটা রিসিভ করবে কি না ভেবে এক মুহূর্ত দ্বিধান্বিত হলেও রিসিভ করে ফেলল। ফোন কানে ধরে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর বলল, হ্যালো, স্লামালিকুম। কে বলছেন, প্লিজ?
ফোনের ওপাশ থেকে স্পষ্ট গলায় স্পষ্ট ভাষায় জবাব এলো, নয়ন, আমি জয়া বলছি।
নয়ন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। কী বলবে বুঝতে পারল না, চুপ করে রইল বাকরুদ্ধের মতো। কিছু শুনতে না পেয়ে জয়া তখন আবার বলল, হ্যালো? নয়ন? শুনতে পাচ্ছ?
নয়ন তাড়াতাড়ি করে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, জয়া। শুনতে পাচ্ছি। কেমন আছ তুমি?
এইতো। চলে যাচ্ছে। তুমি কেমন আছ, নয়ন?
আমি ভালো আছি, জয়া। কিন্তু আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। আমার নাম্বার এখনও আছে তোমার কাছে?
আরে নাহ, আমি বছরে দুতিনবার করে ফোন পাল্টাই। কী করে থাকবে নাম্বার! র্যাগ ডের ম্যাগাজিন থেকে তোমার নাম্বারটা খুঁজে নিয়ে ফোন করলাম।
র্যাগ ডের ম্যাগাজিন থেকে? ও হ্যাঁ। ওটায় তো ব্যাচের সবার নাম্বার ছেপে দেয়া হয়েছিল।
হ্যাঁ। কাজের কাজ হয়েছিল একটা। ক্যাম্পাস ছাড়ার পাঁচ বছর পরেও বন্ধুদের নাম্বার কী সুন্দর হাতের নাগালে আছে! চাইলেই যোগাযোগ করা যায়। তা বলো, হঠাৎ স্মরণ করলে, ফোন করতে চাইলে, কোনো জরুরি দরকার?
না, না, তা না। ফেসবুক ঘাঁটতে ঘাঁটতে মনে পড়ল তোমার কথা।
ফেসবুকে আমার পেঁচামার্কা ফেসটা দেখে মনে পড়ল?
পেঁচার ঠোঁট যে এত সুন্দর হয় তা কখনো খেয়াল করে দেখা হয়নি।
ও আচ্ছা। ওই ছবিটা দেখে মনে পড়েছে? যাক, কায়দা করে ছবি তোলাটা সার্থক হয়েছে তাহলে। তোমার নজরে পড়া গেল।
হেসে ফেলল নয়ন। নজরে তো কবেই পড়েছ, জয়া – প্রেমিক পুরুষের মতো একথা বলতে গিয়েও বলল না। যা সময়ে বলা হয়নি, তা অসময়ে এসে না-বলা থাকাই ভালো। প্রসঙ্গ বদল করল নয়ন। বলল, তারপর, তোমার আর সব খবর বলো। চাকরি কেমন চলছে? প্রমোশন কয়টা পেলে? আর ঘর-সংসার, ছেলেপুলে?
জয়া নয়নের এই প্রসঙ্গ বদলকে পুরোপুরি এড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। বলল, আমার বাসায় এসো না একদিন, নয়ন? জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে। আজই চলে এসো না?
আসব, আসব। তবে আজ পারছি না। আজ তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আরেকদিন আসব।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে তো কী হয়েছে? বউ বকবে? নাকি মারবে? বউয়ের ভয়ে আসতে চাইছ না, তাই তো?
না, না। বউ পাব কোথায়? ওকাজটি এখনও করা হয়ে ওঠেনি।
বউ নেই? তাহলে অবশ্যই ভূতের ভয়। আমি বুঝি দেখতে ভূতের মতো? থুড়ি, পেতনির মতো?
কী যে বলো না তুমি! তোমাকে ভাবব পেতনি! তুমি তো অপ্সরা, জয়া।
তাহলে বাসায় আসতে ভয় পাচ্ছ কেন? বাচ্চাদের মতো তোমার সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকা মানা তা তো নয়। এসো, এসো। চা খাওয়াব। আমি খুব ভালো চা বানাতে শিখেছি এখন।
থ্যাংকস আ লট, জয়া। কিন্তু তোমার দাওয়াত গ্রহণ করার মতো অবস্থা আমার এই মুহূর্তে নেই। আম সরি। কিছু মনে কোরো না, প্লিজ।
অবস্থা নেই বললেই হলো? কী অবস্থা নেই তোমার? এতদিন পর ক্যাম্পাসের একজন বন্ধুকে পেলাম, এত সহজে ছাড়ছি না। তুমি কোথায় আছ বলো তো। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। ড্রাইভার তোমাকে তুলে নিয়ে আসবে।
নয়ন এমনিতেই নরম মানুষ, কারো সহজ কথাই ফেলতে পারে না। আর এখানে জয়া তো রীতিমতো জোর করছে। জয়াকে ঠেকাবার সাধ্য তার নেই। আর তাছাড়া এই সময় এই অবস্থায় একজন পুরোনো বন্ধুর সাথে, বিশেষত মেয়ে বন্ধু, যার প্রতি আবার অতীতে প্রেমের মতো দুর্বলতা ছিল, তার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলে মনের ভারটা কিছুটা হালকা হলেও হতে পারে। তাই আর প্রতিবাদ না করে সুবোধ ছেলের মতো রাজি হয়ে গেল নয়ন। বলল, আচ্ছা, জয়া। ঠিক আছে, আসছি তোমার বাসায়। গাড়ি পাঠাও। ঠিকানাটা আমি মেসেজ করে দিচ্ছি তোমার ফোনে।
জয়া মিষ্টি করে বলল, ওককে, মাই ফ্রেন্ড। দেখা হচ্ছে তাহলে। বাই।
ফোন রেখে আশেপাশে তাকিয়ে ঠিক কোথায় আছে বুঝতে পারল না নয়ন। এই এলাকাটা তার পরিচিত নয়। অবচেতন মন চেনা রাস্তা ধরে হাঁটে না বোধহয়। দোকানদার মামার থেকে জেনে নিয়ে ওই জায়গাটার ঠিকানা মেসেজ করল নয়ন জয়ার ফোনে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। নয়ন ভাবল, অপেক্ষাই তো জীবন। প্রত্যেকেই কিছু না কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে। আর সবশেষে মৃত্যুর জন্য...
চিন্তাটাকে এগোতে দিল না নয়ন। মামার থেকে চেয়ে নিয়ে আগুন ধরাল আরেক শলাকা গোল্ডলিফ সিগারেটে। কয়েক টান দেবার পরই ফেলে দিতে হলো, সহ্য করতে পারল না পরপর দুটো কড়া গোল্ডলিফ সিগারেট। আর কিছু করার না পেয়ে আরেক কাপ চা নিয়ে বেঞ্চে বসল। চায়ে চুমুক দিয়ে টের পেল অতিরিক্ত দুধ আর চিনি দিয়েছেন মামা। চিন্তা করল সে, মামা কি আমাকে ডাইলখোর ভেবে বসেছে নাকি? বিধ্বস্ত চোখমুখ দেখে কি সেরকম মনে হচ্ছে? যাই হোক, যা ভাবে ভাবুক। ডাইল কোনোদিন খাইনি। এখন খেলে ভালো জিনিসই খাব। আর আছিই কদিন?
নয়নের চা শেষ হবার আগেই একটা গাঢ় নীল রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াল দোকানের সামনে। গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাটা খুলে গেল। নেমে এলো জয়া। সে নয়নের সমবয়সী হলেও তাকে দেখতে লাগছে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের সদ্য পরিপূর্ণ আর সতেজ যুবতীর মতো। তার গায়ে রয়েল ব্লু রঙের সিল্কের শার্ট আর পরনে ডার্ক ব্লু রঙের জিনস। এই রঙের পোশাকে তার গায়ের ফর্সা রং বসন্তের ফুলের মতো ফুটে উঠেছে। এগিয়ে এসে দাঁড়াল সে নয়নের সামনে। বলল, একা একা চা খাওয়া হচ্ছে কেন এখানে? আমি কি চা খাওয়াতাম না?
নয়ন বলল, এখানে খেলে যে তোমার বাসায় খাওয়া যাবে না, তা তো না। নিশ্চয়ই খাব তোমার চা। কিন্তু তোমার ড্রাইভার কোথায়? তুমি কেন গাড়ি চালাচ্ছ?
কেন? আমি কি ড্রাইভিং জানি না? নাকি মেয়েদের গাড়ি চালানো মানা? কী বলতে চাচ্ছ?
না, না। তা কেন বলব! বলছি, ড্রাইভার থাকতে তুমি কেন, ড্রাইভারকেই তো পাঠাবে বললে আমাকে।
ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি আজকের মতো। ভাবলাম নিজের বন্ধুকে নিজেই নিয়ে আসি। ভালো করেছি না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব ভালো করেছ। আম ফিলিং অনার্ড। চলো যাই।
জয়া আর নয়ন একসাথে গাড়ির দিকে পা বাড়াল। দুপা এগোতেই দোকানদার মামার ডাকে থামতে হলো তাদেরকে। মামা বলছেন, এই মামা, বিল দিয়া যান।
দ্বিতীয় দফার চা-সিগারেটের দাম দিতে ভুলে গেছে, খেয়াল হলো নয়নের। দোকানে ফিরে গিয়ে দাম দিতে দিতে অপরাধীর মতো সে বলল, সরি, মামা, সরি। ভুলে গেসিলাম। এই ন্যান।
বিল দিয়ে জয়ার কাছে ফিরে এলো নয়ন। দুজনে পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। জয়া বসল ড্রাইভিং সিটে। কারণ, প্রথমত, গাড়িটা জয়ার; আর দ্বিতীয়ত, নয়ন ড্রাইভিং জানে না। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল জয়া। ধুলো উড়িয়ে চলে গেল গাড়ি।
গাড়িতে বসে নয়ন আর জয়ার কথা হলো খুব সামান্য। জয়ার পূর্ণ মনোযোগ গাড়ি চালানোতে। গাড়িটা খুব দামি না। কিন্তু চলল রাজকীয় ভঙ্গিতে, জয়ার মনোযোগী ড্রাইভিঙের গুণে। জয়া দেখতে যতটা উষ্ণ, তার ড্রাইভিং ততটাই শীতল। জয়ার কাছেই ড্রাইভিংটা শিখে নিতে হবে, ভাবল নয়ন, তাহলে নরকে গিয়ে কিংবা হয়তোবা স্বর্গেও গাড়ি চালাবার প্রয়োজন যদি হয়েই যায় তবে আর লজ্জিত হতে হবে না।
জয়ার বাসা কাছেই, তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেল তারা। নয়নকে বসার ঘরে রেখে ভেতরে চলে গেল জয়া। নয়ন ঘরটা দেখতে লাগল। সুন্দর করে সাজানো ঘর। একদিকের দেয়ালে দৈত্যাকার টিভি। তার বিপরীত দিকের দেয়ালের পুরোটা জুড়ে বইয়ের তাক। কোনো তাকেই তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই, এত বই! তৃতীয় দেয়াল পুরোটাই জানালা, মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত। জানালার আকাশি রঙের ভারি পর্দা দুপাশে জড়ো করে রাখা। আর শেষ দেয়ালটা জুড়ে পেইন্টিং আর ফটোগ্রাফের কোলাজ করা।
পুরো ঘরটা একবার ঘুরে দেখে জানালার দিকে মুখ করে রাখা সোফায় এসে বসল নয়ন। খানিক পরে জয়া ফিরল চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে। পোশাক বদলে ঘরোয়া পোশাক পরে এসেছে সে। হালকা ছাই রঙের ঢিলেঢালা স্লিভলেস টিশার্ট গায়ে তার। পরনে কালো রঙের ঢোলা ট্রাউজার। চায়ের ট্রেটা টেবিলে নামিয়ে রাখার সময় অভিকর্ষজ টানে তার স্তনসন্ধিতে জোয়ার এলো। নয়নের চোখ এড়াল না সেটা। তার চোখ, হৃদয় আর শরীর নেচে উঠল কামুকের মতো। শারীরিক এবং মানসিক দুর্বলতার জন্যেই হয়তো এই নাচন বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
নয়ন যে সোফাটায় বসেছে, তার সাথে সমকোণে রাখা সোফায়, যেটা বইয়ের তাকের দেয়ালের সামনে রাখা, সেটায় বসল জয়া। এতে তার ফিগারের প্রোফাইল লুকটা আরো স্পষ্ট হলো নয়নের চোখে। এক পলক নজর করে দেখে নিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল সে। নিজেকে সামলে নড়েচড়ে বসল। জয়া চা ঢেলে দিল কাপে। কাপ হাতে নিয়ে নয়ন বলল, ঘর তো সাজিয়েছ দারুণ। তুমি করেছ ডিজাইন?
জয়া নিজের কাপ হাতে নিয়ে চায়ে চুমুক দিল। বলল, আরে নাহ, আমার এক সিনিয়র কলিগের বউ ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। উনি করে দিয়েছেন ডিজাইন।
তাই বলো, আমি তো ভাবছিলাম তোমার দ্বারা এত সুন্দর ডিজাইন কীভাবে সম্ভব হলো।
সম্ভব কীভাবে হবে? আমি কি এই সাবজেক্ট পড়েছি? আর তুমিই বা কী বোঝো ডিজাইনের? আবার আমার কথা বলছ!
জয়া সামান্য রেগে গেছে। নয়ন তাই সামাল দেবার উপায় খুঁজল মনে মনে। প্রশংসা দিয়ে যেকোনো নারীর গরম মাথা ঠান্ডা করা যায়। বুদ্ধিমান পুরুষের মতো এই কৌশল অনুসরণ করে নয়ন বলল, চা-টা কিন্তু দারুণ হয়েছে, জয়া।
জয়া গলে গেল। বলল, থ্যাংকস। তারপর, তোমার খবর বলো। তোমার ছোটবোনটা কেমন আছে? আঁখি না নাম?
ওরে বাবা! ওর নামও তোমার মনে আছে! হ্যাঁ, ও ভালো আছে। বিয়ে দিয়েছি গত বছর।
ওয়াও! গ্রেট! তোমার............
পুরোনো বন্ধুদের দেখা হলে কথার অভাব হয় না। এটা-সেটা নিয়ে কথা বলতে বলতে জয়া-নয়নের আড্ডা বেশ জমে উঠল। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের নিয়ে কথা হলো। টিচার, সিনিয়র, জুনিয়র, পিয়ন-দারোয়ান-মামা, সবাইকে নিয়েই কথা হল। অনিকের প্রসঙ্গ দুয়েকবার এলেও জয়া কেমন যেন এড়িয়ে গেল সেটা।
আড্ডায় বিরতি দিয়ে আরেক রাউন্ড চা বানিয়ে আনল জয়া। চা নিয়ে নয়ন খুব নির্দোষভাবে জিজ্ঞেস করল, অনিক ভাই ফিরবে কখন অফিস থেকে?
একেবারে হঠাৎ করে জয়ার চেহারা বদলে গেল। সিরিয়াস হয়ে গেল সে। চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল টেবিলে। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল, ফিরবে না। আমরা আলাদা হয়ে গেছি।
নয়ন এরকম কিছু শোনার আশা করেনি একেবারেই। তাই কী বলবে ভেবে বের করতে পারল না কিছুক্ষণ। মিনিটখানেক পর কোনোরকমে বলল, আম রিয়েলি সরি, জয়া। কিন্তু কেন? অনিক ভাইয়ের মতো তো মানুষ হয় না।
জয়া প্রায় চিৎকার করে উঠল, নয়ন! প্লিজ! এসব বাজে কথা বলবে না! অনিকের প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইলে এখান থেকে চলে যাও এখনই!
রীতিমতো ফুঁসে উঠেছে জয়া। সে একদমই এরকম মেয়ে না। খারাপ ব্যবহার তার চরিত্রে ছিল না কখনও। নয়ন বুঝল, অনিক ভাইয়ের সাথে যাই হয়ে থাকুক জয়ার, সেটা নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু।
জয়া নয়নকে চলে যাবার কথাটা মন থেকে বলেনি তা বুঝেছে নয়ন। আর অনিক ভাই প্রসঙ্গে যে এখন কোনো কথাই বলা যাবে না, সেটাও খুব ভালো বুঝেছে। কিন্তু তাদের দুজনেরই এখন কথা বলা দরকার। এরকম পুরোনো বন্ধুর সাথে এভাবে কথা কাটাকাটি করে বিদায় নেবার অবস্থা তাদের কারোরই নেই। নয়ন কথা বলার প্রসঙ্গ খুঁজল আশেপাশে তাকিয়ে। জয়ার সোফার পেছনের বইয়ের তাক চোখে পড়তেই প্রসঙ্গ পেয়ে গেল অকূলে কূল পাবার মতো। বলল, এত বই কেন? গেস্টদের দেখানোর জন্য রেখেছ নাকি?
নয়ন যে কথার গতি অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে সেটা ঠিকই বুঝল জয়া। গেস্টদের দেখাবার কথাটা যে শুধু সামান্য খোঁচা দেবার জন্যে বলেছে সেটাও বুঝল। নয়নকে সাহায্য করল সে। বলল, হ্যাঁ, দেখানোর জন্যই আসলে রাখা। আর লেখালেখিটা সিরিয়াসলি শুরু করেছি। বই না পড়লে তো লেখক হওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে শখের লেখিকা হিসেবে জয়ার বেশ খ্যাতি ছিল। ক্যাম্পাসের সব প্রকাশনায় তার লেখা থাকতই। সেসবের প্রায় সবই পাঠকপ্রিয়তা পেত। তবে তা তার লেখার গুণে নাকি তার প্রায় অতুলনীয় রূপের গুণে, সেটা নিয়ে নয়নের বরাবরই সংশয় ছিল। সুন্দরীদের সমালোচক সব যুগে সব জায়গাতেই কম। জয়ার অতি নগণ্য সংখ্যক সমালোচকদের একজন ছিল নয়ন। তবে তার যে লেখায় ভালো করার সম্ভাবনা আছে চেষ্টা করলে, এটা নয়নও স্বীকার করত। সে তখন থেকেই চাইত জয়া পেশাদার লেখকদের মতো নিয়মিত লেখার কথা ভাবুক। তাই এখন তার মুখে সিরিয়াসলি লেখার কথা শুনে খুব খুশি হলো। বলল, সত্যি? ওয়াও! কী লিখছ? গল্প, কবিতা, উপন্যাস?
নয়নের কণ্ঠের উচ্ছ্বাসটা মন ভালো করে দিল জয়ার। সে বলল, এখন আপাতত গল্পই লিখে যাচ্ছি। আর উপন্যাসের প্লট খুঁজছি। মনের মতো প্লট পাচ্ছি না।
আর কবিতা?
মাঝেমাঝে লিখি।
বইমেলার তো বেশিদিন বাকি নেই। বই আসছে তো তোমার?
হ্যাঁ, এবার একটা গল্পের সংকলন আসছে।
আর উপন্যাস পাচ্ছি কবে?
তুমি এখন প্লট দাও, পরের বইমেলায় উপন্যাস দিচ্ছি তোমাকে।
নয়ন এতক্ষণ গল্প করতে করতে নিজের অসুখটার কথা আর সময় বেঁধে দেয়া জীবনের কথা একরকম ভুলেই গিয়েছিল। প্লটের কথায় মনে পড়ল তার। সে ভাবল, এটা কি একটা উপন্যাসের প্লট হতে পারে? একটা মানুষের ক্যানসার হয়েছে। কিছুদিন পর মারা যাবে। এটা নিয়ে কি উপন্যাস হবে?
নয়ন ব্যাপারটাকে একটু ঘুরিয়ে অন্যরকম করে গল্পের মতো ঢঙে বলল জয়াকে, ধরো আমাদের বয়সী একটা মেয়ে। তার ক্যানসার ধরা পড়েছে। সে মারা যাচ্ছে। আর বছরখানেক হয়তো বাঁচবে। এটা কি তোমার লেখার মতো ভালো একটা উপন্যাসের প্লট হতে পারে?
জয়ার সম্ভবত মনে ধরল আইডিয়াটা। সোফায় দুপা তুলে ভাঁজ করে বসল সে। কপাল কুঁচকে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, হতে পারে। কিন্তু কোনো ইনফরমেশন ছাড়া তো এই গল্প লেখা যাবে না।
তুমি তো আর গবেষণার বই লিখবে না। তুমি লিখবে উপন্যাস। ফিকশন।
হ্যাঁ, উপন্যাস। কিন্তু তারজন্যও কিছু ইনফরমেশন দরকার হয়।
কী ইনফরমেশন দরকার তোমার? ডাক্তারি ইনফরমেশন?
হ্যাঁ। তবে সেটা সামান্য। আমার লাগবে ক্যানসার ধরা পড়ার পর সেই মেয়েটার অনুভূতি, তার আশেপাশের মানুষের অনুভূতি, তাদের জীবনের পরিবর্তন, জীবনের ঘটনাপ্রবাহ, এসব ইনফরমেশন।
এটাকেই কি তোমরা লেখকরা রিসার্চ বলো?
হ্যাঁ। সেরকমই।
এসব তো তুমি পড়াশোনা করেও জানতে পারবে।
হ্যাঁ, তা পারব। কিন্তু একজন রোগীর থেকে ইনফরমেশন নিতে পারলে লেখাটাকে বেশি ভালো করতে পারব।
নিজের অসুখের কথাটা জয়ার কাছে পুরোপুরি চেপে গেল নয়ন। অসুখটা কোনো বলে বেড়ানোর মতো ব্যাপার না। আর তাছাড়া এটা বলে ফেললে জয়া আর এই প্লটটাকে গল্প হিসেবে ভাবতে পারবে না, তখন আর নির্মোহ লেখকের মতো লিখতেও পারবে না - এরকম মনে করল নয়ন। সে বলল, এখন এরকম ক্যানসার আক্রান্ত লোক তুমি পাবে কোথায়?
সেটা কঠিন না। হাসপাতালে খোঁজ নিলে পাওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা কী জানো? মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনের কথা অচেনা মানুষের সাথে শেয়ার করতে চায় না।
তাহলে?
সবচেয়ে ভালো হতো এরকম একজন রোগীর শেষ দিনগুলোর ব্যক্তিগত ডায়েরি পেলে।
তা তো অবশ্যই ভালো হতো। কিন্তু এরকম ডায়েরি তুমি কোথায় পাবে? তারচেয়ে বরং পড়েই রিসার্চ করা শুরু করে দাও।
শুরু করে দাও মানে! আমি কি বলেছি নাকি এই গল্প লিখব?
বলোনি? ও আচ্ছা।
নয়ন আশাহত হলো। তবু মনে মনে ঠিক করল আজ থেকেই প্রতিদিন ডায়েরি লেখা শুরু করবে। লিখে যাবে শেষ দিনটা পর্যন্ত। আর আঁখিকে বলে রাখবে সময় এলে যেন ডায়েরিটা জয়ার হাতে পৌঁছে দেয়।
জীবনের কাছে তো হেরে যেতেই হবে। নিজের গল্পটা জয়ার মাধ্যমে পৃথিবীতে রেখে যেতে পারলে হয়তো স্মরণীয় মানুষদের মতো সময়ের সাথে দৌড়ে অনেকদূর যাওয়া যাবে, শেষ পর্যন্ত জিততে না পারলেও।
জয়া এই গল্প লিখুক বা না লিখুক নয়ন ডায়েরি লিখে যাবে। জীবনের সার্থকতা কীসে তা নয়ন জানে না। তবে এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে নিজের গল্পটার মাধ্যমে জয়ার সাহায্যে সময়ের নিষ্ঠুর পথে নিজের পায়ের একটা ছাপ অন্তত রেখে যেতে পারবে। আর এতে তার জীবনটা সার্থকতা পাবে অন্তত কিছুটা হলেও।
জয়া যদিও সরাসরি এই গল্পের আইডিয়াটা প্রত্যাখ্যান করেনি, তবু ব্যথিত হয়েছে নয়ন। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ একটু কম থাকাই স্বাভাবিক। তার আর এখন গল্প করতে ইচ্ছে করছে না জয়ার সাথে। তাদের গল্পের সুতোটা আজকের মতো এখানেই কেটে গেছে। অভিমান করার মতো সম্পর্ক তাদের নয়, তবু জয়ার ওপর খানিকটা অভিমান হয়েছে নয়নের। এই অনুভূতি গোপন করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল সে। হাতঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে যেন খুব দেরি হয়ে গেছে এরকম একটা ভাব করে হাসিমুখে বলল, এইরে, অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ উঠি তাহলে, জয়া।
জয়া সময় দেখল দেয়ালঘড়িতে। বলল, কই আর রাত হয়েছে? বউ তো নেই ঘরে। ঠিক করে বলো তো, ডেট আছে? গার্লফ্রেন্ড ওয়েট করছে?
নয়ন হাসল। বলল, নাহ, এই বয়সে আর গার্লফ্রেন্ড। আসলে সেই সকালে বেরিয়েছি তো, ক্লান্ত লাগছে। অনেকক্ষণ তো আড্ডা দিলাম। এখন বাসায় যাই।
জয়া নয়নের কথা বিশ্বাস করে অথবা অন্য কোনো কারণে বলল, ঠিক আছে। আজ তাহলে ছেড়ে দিচ্ছি। দাওয়াত দিয়ে রাখলাম। যেকোনো দিন চলে আসবে, কেমন?
নয়ন উঠে দাঁড়াল। জয়াও উঠে দাঁড়াল। নয়ন বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বাসায় ফেরার পথে নয়ন কয়েক দোকান ঘুরে পেটমোটা একটা ডায়েরি আর সুন্দর একটা কলম কিনে নিল। বাসায় পৌঁছে রাতের খাবারের পর সে শান্তভাবে লিখতে বসল নতুন কেনা ডায়েরিতে, ক্ষুদ্র কিন্তু বিস্ময়কর জীবনের গল্প।
এদিকে নয়ন বেরিয়ে যাবার পর জয়া সোফায় বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল দরজার দিকে। তারপর উঠে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল তার লেখার টেবিলে। অনলাইনে ক্যানসার সম্পর্কিত সব ধরনের ফিকশন এবং নন-ফিকশন বই খুঁজে খুঁজে পছন্দ করে অর্ডার করতে শুরু করল দক্ষ লেখকের মতো রিসার্চ করার জন্যে। আসলে নয়নের আইডিয়াটা খুবই পছন্দ হয়েছে তার। এখন এটা নিয়ে পড়াশোনা করে দেখবে একটা প্লট দাঁড় করানো যায় কি না। প্লট দাঁড়িয়ে গেলে উপন্যাস লেখায় হাত দেবে। মৃত্যুপথযাত্রী ক্যানসারের রোগীরা যেন জীবনের প্রতি ভালোবাসা না হারায়, এমন একটা আশা বা বার্তা দেয়ার চেষ্টা করবে সেই উপন্যাসে। কারণ সে মনে করে মানুষ যতদিনই বাঁচুক, যে অবস্থাতেই বাঁচুক, জীবনকে ভালোবেসেই বাঁচা উচিত।
নয়ন ডায়েরি লিখছে। লিখতে লিখতে আশার মায়াবী আলোয় না-লেখা উপন্যাসের পাতায় নিজের নাম দেখতে পাচ্ছে।
সেই একই আলোয় জয়া দেখতে পাচ্ছে সেই না-লেখা উপন্যাসের আবছা অবয়ব।
আর মানুষের সীমানার বাইরে কোথাও খুব ধীরগতিতে আলোর মতো জ্বলে উঠছে সেই উপন্যাস।
জয়া ভাবছে উপন্যাসটা উৎসর্গ করবে শুধু নয়নকেই।
Continue reading by purchasing the full book
Reader Reviews
"Absolutely captivating from start to finish. The author's prose is beautiful and the story kept me turning pages late into the night."
— Sarah M.
"One of the best books I've read this year. The characters feel real and the plot is masterfully crafted. Highly recommended!"
— James K.